শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০১:২০
ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং আরব-ইসলামী দেশগুলোর বিরোধের অবসান চাই: ইরাকি আলেম

ইরাকের ধর্মীয় নগরী নাজাফের জুমার খতিব হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ সদরুদ্দিন কুবানচি বলেছেন, ইসরায়েলের প্রকাশ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধের অবসান ঘটানো জরুরি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তিনি সিরিয়ায় দামেস্ক থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের উপস্থিতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

নাজাফে আশরাফের ফাতেমিয়া হুসাইনিয়ায়ে আজমে জুমার নামাজের খুতবায় সাইয়্যেদ সদরুদ্দিন কুবানচি ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দেন।

মন্ত্রিসভা পূর্ণ করতে বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ
ইরাকের মন্ত্রিসভা পূর্ণ করতে বিলম্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১১৫ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো ৯টি মন্ত্রণালয় মন্ত্রীশূন্য রয়েছে।

মন্ত্রী নিয়োগ বাকি থাকা মন্ত্রণালয়গুলো হলো—প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা, নির্মাণ ও আবাসন, সংস্কৃতি, শ্রম, যুব ও ক্রীড়া এবং অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুত বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তিনি বলেন, এর প্রধান কারণ হলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘বিদেশি ভেটো’ বা বহিরাগত হস্তক্ষেপ। আমরা কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক এবং মন্ত্রিসভার প্রধানের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন দ্রুত মন্ত্রিসভা পূর্ণ করেন এবং বিদেশি চাপ থেকে মুক্ত থাকেন।

ইসরায়েলের প্রকাশ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চাই
আঞ্চলিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে শায়খ কুবানচি বলেন, সিরিয়ায় দামেস্ক থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের উপস্থিতির ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ এ বিষয়ে আরব লীগ নীরব রয়েছে। একই সময়ে আরব দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার সংঘাতে ব্যস্ত রয়েছে; যেমন সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সংঘাত।

তিনি বলেন, “আমরা ইসরায়েলের প্রকাশ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চাই। একই সঙ্গে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধেরও অবসান চাই।”

তিনি আরও বলেন, লেবাননের জনগণের ওপর ইসরায়েলি হামলাও অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলায় শত শত মানুষ শহীদ এবং এর কয়েক গুণসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে। অথচ আরব বিশ্ব নীরব রয়েছে। বরং বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ২৩ বার সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে—যা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।

ধর্মীয় খুতবা: মসজিদে উপস্থিতির ফজিলত
ধর্মীয় খুতবায় তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেওয়ার পর কুবানচি মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ফজিলত সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন।

ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর শিষ্য ফাদলকে বলেছেন, “হে ফাদল! মসজিদে আগমনকারী ব্যক্তি তিনটির কোনো একটি লাভ না করে ফিরে যায় না—হয় এমন একটি দোয়া করে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান; অথবা এমন একটি দোয়া করে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার কাছ থেকে বিপদ দূর করেন; অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এমন কোনো ভাইয়ের সন্ধান লাভ করে, যার মাধ্যমে সে উপকৃত হয়।”

এরপর তিনি নারীদের মসজিদে উপস্থিত হওয়া ও জামাতে নামাজ আদায়ের বিষয়ে প্রচলিত একটি বর্ণনার ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অথবা আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি যে বক্তব্যটি “নারীর মসজিদ তার ঘর”—এই অর্থে উদ্ধৃত করা হয়, তার অর্থ এই নয় যে নারীদের মসজিদে উপস্থিত হওয়া বা জামাতে নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব নয়।

আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী সিস্তানির ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো নারীর জন্য অধিকতর পর্দাশীল ও নিরাপদ স্থান বোঝানো। অর্থাৎ, মসজিদ যদি নারীর জন্য অধিকতর পর্দাশীল ও উপযুক্ত হয়, তাহলে সেখানে উপস্থিত হওয়া মুস্তাহাব; আর যদি তার ঘর অধিকতর পর্দাশীল হয়, তাহলে ঘরে অবস্থান করাই উত্তম।

এ কারণে আমাদের ফকিহরা বলেন, মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের মুস্তাহাব হওয়া নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

তিনি আরও বলেন, “নারীর মসজিদ তার ঘর”— এই বাক্যটি বর্ণনার মূল শব্দ নয়। বরং বর্ণনায় এসেছে: “খাইরু মাসাজিদি নিসায়িকুম আল-বুয়ুত”—অর্থাৎ, “তোমাদের নারীদের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের ঘর।”

এর অর্থ হলো, নারীর জন্য তার ঘর ইবাদতের উপযুক্ত স্থান। তবে এর সঙ্গে নারীদের মসজিদে যাওয়া, জিয়ারত করা, হজ, ওমরাহ এবং অনুরূপ ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মুস্তাহাব হওয়ার কোনো বিরোধ নেই।

নির্জনতা নয়, সামাজিক সম্পৃক্ততার আহ্বান
শায়খ কুবানচি বলেন, আমরা এই বিষয়টিকে “নির্জনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সামাজিক সম্পর্কের প্রতি আহ্বান” হিসেবে বিবেচনা করি।

তিনি বলেন, মসজিদে প্রবেশের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—“অথবা এমন কোনো ভাইয়ের সন্ধান লাভ করে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর পথে উপকৃত হয়।”

একজন মুমিনের উচিত নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে একজন ঈমানদার ও উপকারী বন্ধুর সন্ধান করা।

নারীদের জিয়ারত ও জামাতে নামাজ
নাজাফের এই খতিব বলেন, এ কারণেই ফকিহরা মনে করেন, আহলে বাইতের ইমামদের (আ.) জিয়ারত নারীদের জন্যও মুস্তাহাব, যেমন পুরুষদের জন্য মুস্তাহাব।

একইভাবে জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য এই ফজিলত প্রযোজ্য।

তিনি বলেন, হযরত খাদিজা (সা.আ.) মসজিদুল হারামে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে নামাজ আদায় করতেন। একইভাবে হযরত ফাতিমা (সা.আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে জুমার নামাজ আদায় করতেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা জুমুআর একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন: “আর তারা যখন কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা খেল-তামাশা দেখতে পায়, তখন তার দিকে ছুটে যায় এবং আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে যায়।”

শায়খ কুবানচি বলেন, এসব বিষয় থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলামী শিক্ষায় ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং ঈমানদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha